অধিকাংশ মানুষ চায় তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, বেশি সম্পদ অর্জন করবে এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকবে। কিন্তু যখন তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হয়ে যায়, তখন তারা ঋণ নেওয়ার সহজ পথ বেছে নেয়। কিন্তু ঋণের বোঝা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে এটি মানসিক চাপ, হতাশা ও দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়। এটাকে এক ধরণের অতৃপ্তি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ বলা যেতে পারে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ঋণ গ্রহণের প্রবণতা মস্তিষ্কের ডোপামিন (Dopamine) ক্ষরণের সাথে সম্পর্কিত। নতুন কিছু কেনার সময় বা বেশি টাকা ব্যয়ের সময় মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা সাময়িক আনন্দ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে ঋণের চাপ এবং আর্থিক সংকট ব্যক্তিকে আরও বেশি মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়।অনেক ক্ষেত্রে আত্মহননের পথ ও বেছে নিতে দেখা যায়।
আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক সফলতাকে সামাজিক স্বীকৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে অনেকেই সমাজের কাছে নিজেদের উচ্চ জীবনমান দেখানোর জন্য তাদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ব্যয় করে। এটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে "ডিসপ্লে কনজাম্পশন" (Conspicuous Consumption) নামে পরিচিত।
এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব ও ফাঁদ অনুঘটকের মতো কাজ করে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে ঋণ, ইএমআই সুবিধা এবং ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সহজলভ্য ঋণের সুযোগ প্রদান করে। অনেক মানুষ এই প্রলোভনে পা দেয় এবং পরবর্তীতে উচ্চ সুদের ফাঁদে আটকে পড়ে। বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক এখন "Buy Now, Pay Later" অফার দিচ্ছে, যেখানে মানুষ এখনই পণ্য কিনতে পারছে এবং পরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করছে।এক্ষেত্রে অনেককে ভবিষ্যতের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত কেনাকাটা করতে উদ্বুদ্ধ করছে।
তাহলে এই জাল থেকে মুক্তির উপায় কি ? এককথায় আর্থিক সচতেনতা বৃদ্ধি। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত তার আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং অহেতুক ঋণ গ্রহণ এড়ানো। বাজেট পরিকল্পনা এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এ ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচতে মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত চিকিৎসার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে সেক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) একটি কার্যকর পদ্ধতি। এটি ব্যক্তিকে তাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন করে এবং সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
নিজেকে সমাজের অন্যদের সাথে তুলনা করা বন্ধ করতে হবে এবং "সাধ্যের মধ্যে সুখী থাকা" এই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন লোভনীয় বিজ্ঞাপন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া কমানোর জন্য ডিজিটাল ডিটক্স করা জরুরি। ব্যক্তির উচিত তার আয়ের অন্তত ২০% সঞ্চয় করা এবং ভবিষ্যতের জরুরি পরিস্থিতির জন্য একটি ফান্ড তৈরি করা।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং অনিয়ন্ত্রিত ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যক্তি শুধু আর্থিক সংকটেই পড়ে না, বরং তার মানসিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হয়। এটি ব্যক্তির উদ্বেগ, হতাশা ও অনিদ্রার কারণ হতে পারে। সুতরাং, আর্থিক সচেতনতা, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকা আমাদের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত সচেতন জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বজায় রাখা, যাতে আমরা ভবিষ্যতে সুস্থ ও সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারি।